কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি

    হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি



    রাতের আকাশে পূর্ণিমার আলো ঝলমল করছে। গ্রামের পুকুরপাড়ে বসে থাকা রিহানের চোখদুটো কেমন যেন অদ্ভুত শূন্যতায় ভরা। সে অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে আছে, যেন কিছু একটা খুঁজছে যা হয়তো কখনো ছিল, আবার হয়তো কখনোই ছিল না।

    রিহান এখন শহরে থাকে, চাকরির কারণে গ্রামে আসা হয় না বললেই চলে। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনের ভেতর একটা শূন্যতা অনুভব করল, মনে হলো, কিছু একটা হারিয়ে গেছে। অফিস থেকে হুট করেই ছুটি নিয়ে সে ছুটে এলো গ্রামের বাড়িতে।

    শৈশবের স্মৃতিগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এই পুকুরপাড়েই তো সে আর সিয়াম ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতো। তখন ছিলো অবাধ স্বাধীনতা, কোনো চিন্তা ছিল না, ছিল শুধু খেলার আনন্দ। কিন্তু সিয়াম এখন কোথায়? অনেক বছর হয়ে গেল, ওর কোনো খবর নেই।

    একসময় রিহান চোখ বন্ধ করল।

    স্মৃতির পাতা উল্টে সে চলে গেল পনেরো বছর আগের এক সন্ধ্যায়। সেদিনও এমনই পূর্ণিমা রাত ছিল। দুজন বন্ধু মিলে গাঁয়ের মাঠ পেরিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিল, গাছগাছালির ঘেরা এক নির্জন জায়গায়। ওদের ইচ্ছা ছিল সেখান থেকে একটা রহস্যময় টিলা খুঁজে বের করা, যেটার গল্প বড়রা বলতো।

    কিন্তু সে রাত ছিল অদ্ভুত। গা ছমছমে অনুভূতি হচ্ছিল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে গা ছমছম করছিল, আর কোথা থেকে যেন একটা শিয়ালের ডাক ভেসে আসছিল। রিহান আর সিয়াম একে অপরের হাত ধরে রেখেছিল, যেন ভয় পেলেও কেউ পালাবে না।

    কিন্তু হঠাৎ করেই...

    সিয়াম চিৎকার দিয়ে উঠল, "রিহান! আমি... আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি!"

    রিহান পেছন ফিরে তাকানোর আগেই অনুভব করল, সিয়ামের হাতটা তার হাত থেকে আলগা হয়ে গেল। সে পেছনে তাকিয়ে দেখল—সিয়াম নেই! কোথায় গেল ও? এক মুহূর্তের মধ্যেই সব যেন অন্ধকার হয়ে গেল।

    রিহান ভয় পেয়ে দৌড় দিতে শুরু করল, যত দ্রুত পারে গ্রামে ফিরে গেল। সেদিনের পর থেকে কেউ আর সিয়ামের সন্ধান পায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছে, পুলিশ পর্যন্ত এসেছিল, কিন্তু সিয়ামের কোনো হদিস মেলেনি।

    রিহান সেদিন ভেবেছিল, হয়তো সিয়াম লুকিয়ে ছিল, হয়তো কাউকে কিছু না বলেই কোথাও চলে গেছে। কিন্তু আজ, এত বছর পরও সেই ঘটনা তার মনে একটা গভীর শূন্যতার জন্ম দিয়েছে।

    এখন সে আবার সেই পুকুরপাড়ে বসে আছে, পূর্ণিমার আলোয় পুকুরের জলে এক রহস্যময় প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো, পাশেই কেউ বসে আছে! সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো…

    এক মুহূর্তের জন্য তার দেহের রক্ত হিম হয়ে গেল।

    সিয়াম!

    সে হাসছে, ঠিক আগের মতোই। কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত সেই হাসি, চোখে অস্বাভাবিক এক জ্যোতি।

    "রিহান," সিয়াম ধীরে ধীরে বলল, "তুই এতদিন পরে এলি?"

    রিহান কিছু বলতে পারল না, তার গলা শুকিয়ে গেছে।

    সিয়াম একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, "আমি কখনো হারাইনি রে... তুই-ই ভুলে গিয়েছিলি আমাকে। এখন আবার এসেছিস... এবার আমিও তোকে নিয়ে যাব।"

    রিহান চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। চারপাশের অন্ধকার যেন আরও গভীর হয়ে এল, বাতাস থেমে গেল, শুধু পুকুরের জলে ঢেউ খেলে গেল একবার... তারপর সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

    পরদিন সকালে গ্রামের মানুষজন পুকুরপাড়ে এসে দেখল, রিহান নেই। শুধু তার হাতঘড়িটা পড়ে আছে, জলের ওপরে ভেসে থাকা লালচে ছোপের পাশে...

    গ্রামের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করল, পুলিশও এলো। কিন্তু কোনো হদিস মিলল না। কেবল একজন বৃদ্ধ বললেন,

    "সেই পুরনো গল্পটা আবার সত্যি হলো... যেই জায়গায় কেউ একবার হারায়, সে আর ফেরে না।"

    দিন পেরিয়ে মাস গেল, মাস পেরিয়ে বছর। রিহানের পরিবারও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল স্মৃতির আড়ালে।

    কিন্তু মাঝেমাঝে গ্রামের কিছু মানুষ বলে, পূর্ণিমা রাতে যদি কেউ পুকুরপাড়ে যায়, তাহলে দুটো ছায়া দেখা যায়।
    একটা রিহানের, আরেকটা সিয়ামের।

    ওরা হয়তো আজও খুঁজে ফিরছে সেই পুরনো রহস্যময় টিলাকে, যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না.......

    https://bid.onclckstr.com/vast?spot_id=6071711

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال